প্রত্যাবর্তনের চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের

আকাশটা ছিল সম্ভাবনার সূর্যে ঝলমলে। আশঙ্কার মেঘের বিন্দুমাত্র ছায়া ছিল না। কিন্তু বিনা মেঘে বজ্রপাত তো হয়ে গেল ঠিকই। জিম্বাবুয়ের কাছে প্রথম টেস্টে হারে স্তব্ধ বাংলাদেশ!

কিন্তু সে স্তব্ধতায় গা ডুবিয়ে বসে থাকলে চলছে না। প্রায়শ্চিত্তের শেষ সুযোগ ক্রিকেটারদের সামনে। পরশু থেকে শুরু ঢাকা টেস্টে জিতে সিরিজে সমতা ফেরাতে হবে। সিলেটের ভুলচুক থেকে শিক্ষা নিয়ে ঢাকায় নিজেদের সামর্থ্য মেলে ধরার চ্যালেঞ্জ এবার মাহমুদ উল্লাহর দলের সামনে।

প্রথম টেস্ট শেষে যে এমন বেকায়দায় থাকবে স্বাগতিকরা, কে ভেবেছিলেন! না ভাবার যথেষ্ট কারণও ছিল। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এর আগের সর্বশেষ চার টেস্টেই জিতেছিল বাংলাদেশ। এই সফরের ওয়ানডে সিরিজেও জিতেছে দুর্দান্ত দাপটে। সেটিও সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের মতো দলের সেরা দুই ক্রিকেটার ছাড়া। আত্মবিশ্বাসে তাই টগবগ করে ফুটছিল মাহমুদের দল। পরিসংখ্যানের খাতায় জিম্বাবুয়ের ধূসর পারফরম্যান্সও আরেকটি কারণ। সিলেট টেস্টের আগের ১৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে টানা হার আফ্রিকান দেশটির; সব ফরম্যাট মিলিয়ে। টেস্টে সর্বশেষ জয় পাঁচ বছর আগে, ২০১৩ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে হারারেতে। আর দেশের বাইরে সর্বশেষ জয় ১৭ বছর আগে, ২০০১ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে চট্টগ্রামে। এমন অতীত এবং এমন সাম্প্রতিক অতীতের দলটি সিলেট টেস্ট জিতে যাবে, তা ভাবা যায়নি।

ভাবা যায়নি, প্রথম টেস্টের পর বাংলাদেশকে সিরিজে ফেরার পথ খুঁজতে হবে হন্যে হয়ে।

দুই দলের সর্বশেষ টেস্ট সিরিজ ২০১৪ সালে। সেখানে তিন টেস্টেই জয় বাংলাদেশের। ঘরের মাটিতে সিরিজ জিতলেও পরের মাটিতে তা পারেনি। ২০১৩ সালে নিজেদের দেশের সিরিজে জিম্বাবুয়ে জেতে প্রথম টেস্ট। দ্বিতীয় ম্যাচে ঘুরে দাঁড়িয়ে জিতে সিরিজ সমতায় শেষ করতে পারে মুশফিকুর রহিমের দল। এবার একই চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে মাহমুদ উল্লাহর বাংলাদেশ।

সাকিবের অনুপস্থিতিতে দলের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। সিলেটে হারের পর কোনো খোঁড়া অজুহাত দাঁড় করানোর চেষ্টা করেননি। বরং ব্যর্থতার দায় নিয়েছেন নিজেদের কাঁধে। ‘এভাবে টেস্ট খেলার কোনো মানে হয় না’—বলে কড়া বার্তা দিয়েছেন নিজ দলকে। তাতে যদি ঘুম ভাঙে সবার। শীতনিদ্রা থেকে ওঠা সবচেয়ে বেশি জরুরি ব্যাটসম্যানদের জন্য। সেটি সিলেটের দুই ইনিংসে ১৪৩ ও ১৬৯ রানে গুটিয়ে যাওয়ার কারণেই শুধু নয়। সর্বশেষ চার টেস্টে ছন্নছাড়া ব্যাটিংয়ের জন্য।

বছরের শুরুতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্ট ছিল রানোৎসবের। চট্টগ্রামের সেই খেলাটি হয় ড্র। এর পর থেকেই বাংলাদেশের রানের সঙ্গে আড়ি। ঢাকায় দ্বিতীয় টেস্টের দুই ইনিংসে স্বাগতিকরা অল আউট ১১০ ও ১২৩ রানে। এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দেবেন? ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরেও তো ব্যর্থতার বৃত্তে আটকা পড়ে বাংলাদেশ। দুই টেস্টে অল আউট ৪৩, ১৪৪ এবং ১৪৯, ১৬৮ রানে। দেশের বাইরে পেসসহায়ক উইকেটে খেলা বলে অজুহাত দাঁড় করাবেন? তাহলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুই ইনিংসে ১৪৩ ও ১৬৯ কেন? টানা চার টেস্টের আট ইনিংসে দল দুই শ করতে না পারলে আত্মসমর্পণ ছাড়া উপায় থাকে না। সিলেট টেস্ট শেষে সেই অসহায়ত্বের প্রকাশ অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহর কণ্ঠে।

ব্যাটসম্যানদের ভুল শট নির্বাচন এবং অতিরিক্ত শট খেলার প্রবণতাই সাম্প্রতিক ব্যাটিং বিপর্যয়ের কারণ। ঢাকা টেস্টে সেখানে উন্নতি দেখার জন্য মুখিয়ে টিম ম্যানেজমেন্ট। তবে উইকেটের চাওয়া ভিন্নরকম হবে বলে মনে হয় না। প্রথম টেস্টের একাদশে ছিলেন মাত্র এক পেসার। স্পিনসহায়ক উইকেটে জিম্বাবুয়েকে হারানোর কৌশল ঢাকায় বদলাবে না। সে কৌশল বাস্তবায়নে ক্রিকেটারদের ওপর চাপ বাড়বে শুধু। আর প্রথম টেস্টে বিশ্রামে থাকা মুস্তাফিজুর রহমান একাদশে ফিরবেন নিশ্চিতভাবে।

ইনজুরি পুনর্বাসনে থাকা তামিম ইকবালের ফেরা নিয়েও কথাবার্তা হচ্ছে মৃদু। সিলেটে ব্যাটসম্যানদের ব্যাটে হাসি থাকলে তা হতো না হয়তো। কিন্তু ওই বিপর্যয়ের পর বাঁহাতি ওপেনারের ঢাকা টেস্ট খেলার সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হচ্ছে। যদিও ইনজুরি সারিয়ে তাঁর প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায়। মিরপুরে ব্যাট-বলের অনুশীলন শুরু করলেও ম্যাচ শুরুর জন্য ঝুঁকিটা বড্ড বেশি হয়ে যায়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সিরিজ দিয়েই তাই ক্রিকেটে ফিরবেন তামিম।

এশিয়া কাপ এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের মাঝপথেও দলে নতুন ব্যাটসম্যান যোগ হওয়ার উদাহরণ টাটকা। প্রথম টেস্টে বিপর্যয়ের পর অমন কিছুর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছিল না। তবে শেষ পর্যন্ত ওই ১৫-তেই ভরসা টিম ম্যানেজমেন্টের। একাদশে পরিবর্তন আসবে নিশ্চিতভাবে। ওই এগারোর লক্ষ্য থাকবে ফল পরিবর্তনের। দ্বিতীয় টেস্ট জিতে প্রথম টেস্টের প্রায়শ্চিত্ত করা।

লড়াই জিতেছে জিম্বাবুয়ে, যুদ্ধ নয়। সেই যুদ্ধে না হারার প্রতিজ্ঞা নিয়েই তাই ঢাকা টেস্টে মাঠে নামবে বাংলাদেশ।